মহানবী হজরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কা থেকে মদিনাতে হিজরত করলেন, তখন দেখতে পেলেন সেখানকার অধিবাসীরা 'মেহেরজান' ও 'নওরোজ' নামক দুটি আনন্দ দিবস পালন করে। সাহাবায়ে কেরামগণ আল্লাহর রসুলকে জিজ্ঞেস করলেন যে, তারা সেই আনন্দ উদযাপনে অংশগ্রহণ করবে কি না? প্রত্যুত্তরে মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে এর চেয়ে উৎকৃষ্ট দুটি দিন দান করেছেন। তা হলো: পহেলা শাওয়াল তথা ঈদুল ফিতরের দিন এবং দশম জিলহজ্ব তথা ঈদুল আযহার দিন।"
ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, 'নওরোজ' উৎসবটি মূলত বছরের প্রথম দিন উপলক্ষে উদযাপন করা হত, যা পার্সী মাজুসি তথা অগ্নিউপাসকদের অুনকরণ। উপরোক্ত হাদীসটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নববর্ষ উদযাপন করতে সরাসরি নিষেধ করেছেন।
আমরা আজকে যে থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন করছি, এটা কি নওরোজের আধুনিক রূপ নয়? এটা কি আদৌ মুসলমানদের সংস্কৃতি? নাকি ইহুদি-খ্রিষ্টানদের থেকে ধার করা সংস্কৃতি? থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনের সূচনা ঘটেছিল কাদের মাধ্যমে? একটু মাথা খাটালেই উত্তর পেয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ।
এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে এসেছে:
"من تشبه بقوم فهو منهم"
“যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ করে সে তাদের দলভুক্ত।” অর্থাত,
"যার সাথে যার মুহাব্বাত,
তার সাথে তার কিয়ামত।"
"যার সাথে যার মুহাব্বাত,
তার সাথে তার কিয়ামত।"
তাই যে কোন নওরোজ সেটা থার্টি ফাস্ট নাইট হোক, পহেলা নববর্ষ হোক কিংবা পহেলা মুহররম হোক, বিজাতীয় রীতি হিসেবে প্রত্যেকটি ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এতক্ষণ বছরের প্রথম দিন উপলক্ষে আনন্দ উৎসবের ব্যাপারে কথা বললাম। এবারে আসা যাক, এ দিনে বা রাতে যদি আমরা ইবাদত বন্দেগি করে কাটাতে চাই, সে ব্যাপারে ইসলাম কী বলে।
প্রথমতঃ একটা বিষয় ক্লিয়ার করা দরকার যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য সন হলো হিজরী সন। বাংলা বা ইংরেজি কিংবা পৃথিবীর অন্য যেকোনো সনের বিন্দুমাত্র মূল্য নেই তার কাছে।
দ্বিতীয়তঃ হাদীসে যে সকল দিনকে সম্মানিত ঘোষণা করা হয়েছে (যেমন: সোমবার, বৃহস্পতিবার, শুক্রবার, প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ, আশুরা, শবে ক্বদর, শবে বরাত, ইদুল ফিতর, ইদুল আযহা ইত্যাদি) সেগুলো ব্যতীত আল্লাহ তায়ালার কাছে সকল দিন সমান মর্যাদাপূর্ণ।
সুতরাং, বছরের শেষদিন বা প্রথমদিনকে সম্মান প্রদর্শনপূর্বক বা এ দিনে ভালো কাজ করলে সারাবছর ভালো কাটবে এমন আক্বিদা পোষণ করে বিশেষ কোনো ইবাদত করলে সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ অর্জন ব্যতীত কোনো লাভ হবে নাহ।
এ সম্পর্কে-------
১. ইমাম ফখরুদ্দীন উসমান বিন আলী আয যাইলায়ী বলেন, “নওরোজ ও মেলার নামে কিছু দেয়া নাজায়েয। এ দুই দিনের নামে প্রদত্ত হাদিয়া হারাম; বরং কুফর”। (গ্রন্থ -তাবইনুল হাকায়েক : ৬/২২৮)
২. ইমাম হাফস কবীর রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন:
(ক) “নওরোজ বা বছরের প্রথম দিন উপলক্ষে যদি কেউ একটা ডিমও দান করে, তবে তার পঞ্চাশ বৎসরের আমল থাকলে তা বরবাদ হয়ে যাবে।"
(খ) “যে ব্যক্তি নওরোজের দিন এমন কিছু খরিদ করল যা সে পূর্বে খরিদ করত না, এর মাধ্যমে সে যদি ঐ দিনকে সম্মান করতে চায় তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে।”
৩. হাম্বলি মাযহাবের ফিকহের গ্রন্থ ‘আল-ইকনা’ তে বলা হয়েছে, "কাফিরদের উৎসবে যোগদান করা, সেই দিন উপলক্ষে বেচাবিক্রি করা ও উপহার বিনিময় করা হারাম।"
উপরোক্ত দলিল দেখলে এটা খুব সহজেই অনুধাবন করা যায় যে, থার্টি ফাস্ট নাইট, পহেলা নববর্ষ, পহেলা মুহররম শুধু পালন করা হারাম নয়, বরং ঐ দিবস উপলক্ষে কাউকে শুভেচ্ছা জানানো, কিংবা ঐ দিবসগুলো উপলক্ষে কোন অফার দিলে সেটা গ্রহণ করা, ঐ দিবস উপলক্ষে কেনাবেচা করা, খাদ্যগ্রহণ করা হারাম ও ক্ষেত্র বিশেষে কুফরী। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে বুঝার ও মানার তাওফিক দান করুন। আমিন।
তবে হ্যাঁ, আপনার দৈনন্দিন বা অভ্যাসগত কোনো আমল যদি এ দিনে পড়ে যায়, তাহলে অবশ্যই আপনি তা করতে পারবেন। অথবা, আর দশটা সাধারণ দিন বিবেচনায় যে কোনো নফল ইবাদত করতে পারবেন আপনি, শুধু ইবাদতটি নববর্ষের সাথে বিশেষিত না হলেই হলো। কেউ যদি নিজের নিয়মিত ইবাদতের পরে বা কোনো ইবাদত ছাড়াই আগত বৎসর ভালো কাটার প্রত্যাশায় আল্লাহ তায়ালার দরবারে প্রার্থনা করে, তাতে কোনো বাধা নেই।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: একটা কথা না বললেই নয়, কিছুদিন যাবত নিউজফিড ও মাই ডে তে যে জিনিশটা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে, তা হলো: "১৮ সাল আপনাকে কী কী দিয়েছে বা আপনার কাছ থেকে কী কী কেড়ে নিয়েছে? ১৯ সাল আপনাকে কী কী দিবে বা আপনার কাছ থেকে কী কী কেড়ে নিবে বলে মনে করছেন? এ জাতীয় প্রশ্ন ও উত্তর সংক্রান্ত পোস্ট।" মনে রাখবেন, কোনোকিছু প্রদান করা বা কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সংরক্ষণ করেন, কোনো বৎসর বা সালের ক্ষমতা নেই আপনাকে কোনোকিছু দেওয়ার বা আপনার কাছ থেকে কোনোকিছু কেড়ে নেওয়ার। কেউ যদি এমন বিশ্বাস পোষণ করে থাকেন, তাহলে অতিদ্রুত তওবা ও ইস্তিগফার করে বিশ্বাসকে সংশোধন করুন। ধন্যবাদ।
লিখেছেনঃ খাদিমুল মুরছালীন রিয়াদ
No comments:
Post a Comment